, , চট্টগ্রাম

অনন্য চট্টগ্রাম

জ্বালানি তেলের চড়া দাম: চট্টগ্রাম বন্দরে বেসরকারি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ বৃদ্ধি ৯.৮৫%

জ্বালানি তেলের চড়া দাম: চট্টগ্রাম বন্দরে বেসরকারি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ বৃদ্ধি ৯.৮৫%

নিজস্ব প্রতিবেদক,দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির তীব্র অভিঘাত পড়তে শুরু করেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। ডিজেলের দাম বাড়ার যুক্তি দেখিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরভিত্তিক বেসরকারি ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোগুলো (অফ-ডক) তাদের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ও পরিবহন চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হওয়ায় দেশের লজিস্টিক বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা।
​কেন বাড়ানো হলো এই চার্জ?
​সাম্প্রতিক সময়ে সরকার জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করায় ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকায় (প্রায় ১৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধি) দাঁড়ায়। কন্টেইনার ডিপোগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) জানিয়েছে, ডিপোগুলোর অভ্যন্তরীণ ভারী যন্ত্রপাতি পরিচালনা, জেনারেটর ও প্রাইম মুভার চালানো এবং চট্টগ্রাম বন্দর ও পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) থেকে কন্টেইনার আনা-নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিই ডিজেল ও পরিবহননির্ভর।
​বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার স্বাক্ষরিত সার্কুলারে জানানো হয়, জ্বালানি তেলের এই উল্লম্ফনের কারণে ডিপোগুলোর পরিচালনা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাই সার্বিক কার্যক্রম সচল রাখার স্বার্থে পূর্বনির্ধারিত ভাড়ার ওপর ফুয়েল সারচার্জ হিসেবে ৯.৮৫ শতাংশ অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হয়েছে।
​ যেসব খাতে খরচ বাড়ল
​বেসরকারি আইসিডি বা ডিপোগুলোর এই বর্ধিত চার্জ সরাসরি প্রভাব ফেলবে পণ্য ও কন্টেইনার ব্যবস্থাপনার ৬টি প্রধান ধাপে:
খালি কন্টেইনার পরিবহন: চট্টগ্রাম বন্দর বা পিসিটি থেকে অফ-ডকে খালি কন্টেইনার আনা-নেওয়া এবং লিফট-অন/লিফট-অফ চার্জ।
পণ্য স্টাফিং: ডিপোর ইয়ার্ড থেকে খালি কন্টেইনার সিএফএস (CFS) শেডে স্থানান্তর এবং রপ্তানি পণ্য কন্টেইনারে বোঝাই করার খরচ।
রপ্তানি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং: বোঝাই করা কন্টেইনারগুলো নির্দিষ্ট ইয়ার্ডে সংরক্ষণ এবং জাহাজে তোলার উদ্দেশ্যে পুনরায় বন্দরে ফেরত পাঠানোর পরিবহন ব্যয়।
ভিজিএম (VGM) ও ওজন পরিমাপ: রপ্তানি পণ্যের সঠিক ওজন যাচাইয়ের (Verified Gross Mass) জন্য কন্টেইনার স্কেলে নেওয়া এবং ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া।
আমদানি পণ্য ডেলিভারি: চট্টগ্রাম বন্দর বা পিসিটি থেকে আমদানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার ডিপোতে আনা এবং সেখান থেকে ট্রাকে পণ্য খালাস করে ডেলিভারি দেওয়ার পুরো লজিস্টিকস প্রক্রিয়া।
​ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
​বাংলাদেশের উৎপাদিত রপ্তানি পণ্যের প্রায় শতভাগ এবং আমদানি করা কন্টেইনারজাত পণ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশই এই বেসরকারি অফ-ডক বা ডিপোগুলোর মাধ্যমে হ্যান্ডলিং করা হয়। ফলে হ্যান্ডলিং চার্জ ৯.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সামগ্রিক সাপ্লাই চেইনের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
​বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারে ইতিমধ্যেই নানা অর্থনৈতিক সংকট এবং চড়া ফ্রেইট রেটের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছেন। এর ওপর স্থানীয় পর্যায়ে লজিস্টিক ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তা তৈরি পোশাক (RMG) খাতসহ অন্যান্য প্রধান রপ্তানি খাতের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে। পরিশেষে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে পারে।
​বন্দর ব্যবহারকারী ও বার্থ অপারেটরদের অবস্থাও সংকটাপন্ন
​শুধু বেসরকারি ডিপোই নয়, চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটি ও টার্মিনালে কন্টেইনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা বার্থ অপারেটররাও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে এবং খরচের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দর বাড়ানোর জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানিয়েছে। তাদের দাবি, বর্তমান টেন্ডার দর নির্ধারিত হয়েছিল যখন ডিজেলের দাম অনেক কম ছিল; বর্তমান বাজারদরে এই কাজ চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য আর্থিকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
​জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জেরে কন্টেইনার ডিপোগুলোর এই চার্জ বৃদ্ধি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন এক জটিলতা তৈরি করল। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, লজিস্টিক খাতের এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত আমদানি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে ভোক্তা সাধারণের ঘাড়েই এসে পড়বে। তাই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এবং লজিস্টিক খাতের ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখতে নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।