চট্টগ্রাম ওয়াসার জমি দিয়ে ২২ কোটির ঋণ জালিয়াতির মামলার ছায়ার মধ্যেই শীর্ষ পদে বিতর্কিত নতুন চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়া
চট্টগ্রাম ওয়াসার জমি দিয়ে ২২ কোটির ঋণ জালিয়াতির মামলার ছায়ার মধ্যেই শীর্ষ পদে বিতর্কিত নতুন চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়া
নিজস্ব প্রতিবেদক :চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের শীর্ষ পদে এক বিতর্কিত ও চাঞ্চল্যকর নিয়োগ নিয়ে দেশজুড়ে এবং স্থানীয় সুশীল সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। খোদ চট্টগ্রাম ওয়াসার বিশাল পরিমাণ জমি ভুয়া দলিলে বন্ধক রেখে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে যাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, সেই ব্যক্তিকেই এবার খোদ চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় স্বার্থের সংঘাত ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। উক্ত প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াকে চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে আগামী ৩ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই ওয়াসা ও স্থানীয় মহলে শুরু হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। কারণ, যে প্রতিষ্ঠানের জমি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাত ও ঋণের গ্যাঁড়াকলে ফেলার অভিযোগ রয়েছে মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়ার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, আজ তাকেই সেই প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক বা বোর্ড প্রধান হিসেবে বসানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায় নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়ার মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আজমির ট্রেডিং’-এর নামে ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়।
এই ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা হয়েছিল চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের প্রায় ৯.৫৭ একর (৯৫৮ শতক) জমি।
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রতারক চক্রের সহায়তায় ভুয়া দলিল তৈরি করে সরকারি এই মূল্যবান সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়ে ব্যাংকে বন্ধক রাখা হয়।
ঋণের পরিমাণ: ভুয়া দলিলের এই সম্পত্তির বিপরীতে ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় ২২ কোটি ২৩ লাখ টাকার বেশি ঋণ।
ওয়াসার কড়া আপত্তি ও আইনি লড়াই
পরবর্তীতে মেসার্স আজমির ট্রেডিং ঋণ পরিশোধে খেলাপি হলে ইউনিয়ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই সম্পত্তি নিলামে তোলার জন্য প্রকাশ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ঠিক তখনই বিষয়টি চট্টগ্রাম ওয়াসার নজরে আসে এবং নড়েচড়ে বসে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।
ওয়াসার অবস্থান: ২০২০ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, নিলামে তোলার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া জমিটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জন্য সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণকৃত সরকারি সম্পত্তি।
ওয়াসা জোরালোভাবে জানায় যে, একটি প্রভাবশালী চক্র জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সরকারি এই সম্পত্তি আত্মসাতের পাঁয়তারা করছে এবং ব্যাংকে বন্ধক রেখে অবৈধভাবে ঋণ তুলেছে। এই ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া ও তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল ওয়াসা।
সুশীল সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও স্বার্থের সংঘাত
যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ওয়াসার সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে, তাঁকেই খোদ ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সুশীল সমাজ, দুর্নীতিবিরোধী কর্মী এবং ওয়াসা সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরাসরি স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest)-এর এক চরম নজির। ওয়াসার সম্পত্তি রক্ষা করা যেখানে বোর্ডের প্রধান কাজ, সেখানে খোদ ওয়াসার জমি জালিয়াতির মামলার ছায়ায় থাকা একজন ব্যক্তিকে বোর্ডের প্রধান করা হলে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উসকে দেবে।
জনমনে প্রশ্ন: বিতর্কিত এই নিয়োগের ফলে সাধারণ মানুষের মনে কিছু বড় প্রশ্ন দানা বেঁধেছে:
অভিযুক্ত ব্যক্তি ওয়াসার বোর্ডে আসার পর জমি জালিয়াতি ও ঋণ কেলেঙ্কারির চলমান আইনি প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ থাকবে?
নিয়োগের আগে কি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই পটভূমি যাচাই করেনি?
এই চাঞ্চল্যকর নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার বা স্থানীয় সরকার বিভাগ এই বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়।
এ বিষয়ে জানতে ওয়াসার চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়াকে একাধিক