, , চট্টগ্রাম

অনন্য চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে মশাবাহিত ‘জাপানিজ এনকেফালাইটিস’ ও মস্তিষ্কের প্রদাহ: বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নীরব আতঙ্ক!

চট্টগ্রামে মশাবাহিত ‘জাপানিজ এনকেফালাইটিস’ ও মস্তিষ্কের প্রদাহ: বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নীরব আতঙ্ক!

​নিজস্ব প্রতিবেদকচ: চট্টগ্রাম অঞ্চলে সম্প্রতি মশাবাহিত ‘জাপানিজ এনকেফালাইটিস’ (Japanese Encephalitis – JE) এবং মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত (Encephalitis) রোগের প্রাদুর্ভাব ও তা ঘিরে নতুন করে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত জটিল ও প্রাণঘাতী এই রোগটি সাধারণত গ্রামীণ ও অর্ধ-শহরাঞ্চলে বেশি দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম মহানগরী ও এর আশেপাশের এলাকায় এর সংক্রমণ চিকিৎসকদের ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে বিশিষ্টজন ও চিকিৎসকদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এই মশাবাহিত রোগটিকে নতুন আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
​বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট
​বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর পাশাপাশি সম্প্রতি এনকেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহের বিষয়টি নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিউরোমেডিসিন বিভাগ ও স্থানীয় চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বর, আকস্মিক মস্তিষ্কের পরিবর্তন এবং স্নায়বিক জটিলতা নিয়ে কিছু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চমেক হাসপাতালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু সন্দেহজনক রোগীর নমুনায় এই ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। এছাড়া বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মৃত্যুর ঘটনায় এই রোগের মারাত্মক রূপ নিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
​বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে এই ভাইরাস দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান থাকলেও পর্যাপ্ত এবং সাধারণ ল্যাবরেটরি পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় বহু ক্ষেত্রে এটি ডেঙ্গু, মেনিনজাইটিস বা সাধারণ ব্রেন ফিভার হিসেবে চাপা পড়ে যায়।
​ জাপানিজ এনকেফালাইটিস কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
​জাপানিজ এনকেফালাইটিস হলো ফ্লাভিভাইরাস (Flavivirus) গোত্রভুক্ত একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা সরাসরি মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কে আক্রমণ করে।
​বাহক: এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়—অর্থাৎ এক মানবদেহ থেকে অন্য মানবদেহে সরাসরি ছড়ায় না। এটি মূলত কিউলেক্স (Culex) প্রজাতির মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়।
​প্রধান উৎস: বুনো পাখি এবং শুকর এই ভাইরাসের প্রধান রিজার্ভায়ার বা বাহক হিসেবে কাজ করে। সংক্রামিত পাখি বা শুকরকে কামড়ানোর পর যখন সেই কিউলেক্স মশা মানুষকে কামড়ায়, তখন ভাইরাসটি রক্তে প্রবেশ করে।
​ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা: যেসব এলাকায় ধানক্ষেত, জমা পানি এবং গবাদিপশু বা শুকরের খামার কাছাকাছি থাকে, সেখানে এই মশার উপদ্রব ও সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
​ লক্ষণ ও উপসর্গ
​সংক্রমিত হওয়ার পর সাধারণত ৫ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত এর সুপ্তিকাল থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃদু উপসর্গ থাকলেও প্রতি ২৫০ জনে একজনের ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
​আকস্মিক উচ্চ মাত্রার জ্বর ও তীব্র মাথাব্যথা।
​ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঝিমুনি।
​আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, মানসিক বিভ্রান্তি বা হ্যালুসিনেশন।
​খিঁচুনি এবং দ্রুত রোগী অজ্ঞান বা কোমাচেতন হয়ে পড়া।
​শরীরের কোনো এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া বা পক্ষাঘাতগ্রস্ততার লক্ষণ।
​ কেন এই রোগটি মারাত্মক?
চিকিৎসকদের মতে, জাপানিজ এনকেফালাইটিসে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অবস্থায় পৌঁছানো রোগীদের মৃত্যুর হার প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকের মাঝেই দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সমস্যা, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া বা পক্ষাঘাতের মতো স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা থেকে যায়। মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহের কারণে রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হেমোরেজিক স্ট্রোক বা রক্তক্ষরণের ঝুঁকিও তৈরি হয়।
​ সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ
​চট্টগ্রামে এই রোগটি নিয়ে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সময়মতো সঠিক ল্যাবরেটরি টেস্ট বা রোগ নির্ণয়। সিএমসিএইচ ও নির্দিষ্ট কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানে এর পরীক্ষা শুরু হলেও সাধারণ ক্লিনিক বা বেসরকারি পর্যায়ে এর সহজলভ্যতা নেই। এছাড়া এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট বা শতভাগ কার্যকরী অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। মূলত লক্ষণভিত্তিক (Symptomatic) ও সাপোর্টিভ কেয়ার বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) মাধ্যমেই রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
​ প্রতিরোধ ও করণীয়
​যেহেতু এই রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিরোধই একমাত্র প্রধান হাতিয়ার:
​টিকা প্রদান: উন্নত বিশ্বে জাপানিজ এনকেফালাইটিস প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর টিকা রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে টিকাদান কর্মসূচি চালুর ওপর জোর দিচ্ছেন।
​মশা নিয়ন্ত্রণ: কিউলেক্স মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, বাড়ির আশেপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা এবং নিয়মিত মশারি ব্যবহার করা আবশ্যক।
​সচেতনতা বৃদ্ধি: জ্বর ও খিঁচুনির মতো স্নায়বিক লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিউরোলজি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।
​চট্টগ্রামে জাপানিজ এনকেফালাইটিস এবং মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব কেবল একটি সাময়িক আতঙ্ক নয়, বরং এটি আমাদের ভেক্টর-বোর্ন ডিজিজ সার্ভেইলেন্স বা রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার এক জোরালো বার্তা দেয়। সময়মতো সঠিক ডায়াগনোসিস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা না গেলে এই বিরল অথচ প্রাণঘাতী রোগটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।