বায়েজিদের রৌফাবাদে উর্দুভাষীদের জমি নিয়ে নয়ছয়: স্বাক্ষর জাল, গ্যাস বাণিজ্যে কলোনী ও সরকারি জায়গা দখলের মহোৎসব

বায়েজিদের রৌফাবাদে উর্দুভাষীদের জমি নিয়ে নয়ছয়: স্বাক্ষর জাল,গ্যাস বাণিজ্যে কলোনী ও সরকারি জায়গা দখলের মহোৎসব
নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার রৌফাবাদে উর্দুভাষী বিহারী জনগোষ্ঠীর বসতভিটার জমি কেনাবেচায় নজিরবিহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। আইনি জটিলতা ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মূল্যবান সম্পত্তি। এর পেছনে রয়েছে শরিকদের স্বাক্ষর জালিয়াতি, তথ্য গোপন এবং ভুয়া গ্যাস সংযোগের মতো গুরুতর সব অভিযোগ।
জমি কেনাবেচায় জাল জালিয়াতি:
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ১৫ বছর আগে ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজার কাছ থেকে ৪৭ লাখ টাকায় পাঁচ কাঠা জমি কেনেন লক্ষ্মীপুরের শাহাদাৎ হোসেন বাহার ও মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা। হোল্ডিং নম্বর ৬৯, ৭০ ও ৭১ সংবলিত এই জমি হস্তান্তরের সময় মূল সাতজন শরিক—মো. রাজু, শাকিলা বেগম, রাজিয়া সুলতানা, রোমানা পারভিন রানি, রোজী আক্তার, ফাতেমা বেগম ও ফোরকান আলীর স্বাক্ষর জাল করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চুক্তিপত্রে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে আরও বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ শরিকের নাম ও তথ্য।
ভুক্তভোগী ফরিদা বেগম গং এর অভিযোগ ও আর্তনাদ:

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করেও বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের প্রভাবশালী চক্রের নানা হুমকি-ধমকিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন পরিবারগুলো। তাদের পারিবারিক সূত্রে পাওয়া  জমি এখন হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।জমির মূল শরীকদাররা আরও অভিযোগ করে বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে ভূমিদস্যুরা জাল জালিয়াতির মাধ্যমে স্টাম্প তৈরি করে জমি বেচা বিক্রি করেছে। তারা বলেন, আমরা কিছুই জানিনা এখন আমরা  অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছি।

​বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ডিসি মহোদয় এর কাছে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। সরকারের কাছে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো হলো:

​ অবিলম্বে ভূমিদস্যু ও জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজা ও বাহারসহ নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের আইনের আওতায় এনে নিরপেক্ষ তদন্ত করা। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া স্টাম্প ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের কার্যকারিতা অবিলম্বে বাতিল করা।

​ভুক্তভোগী ফরিদা গং এর দাবি তাদের  প্রাপ্ত জমি তাদের  জিম্মায় বুঝিয়ে দেওয়া এবং তাদের ও পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

​ভুমিহীন বিহারিদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি সম্পত্তি জবরদখলকারী প্রভাবশালী ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শৈথিল্য না দেখিয়ে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও এলাকার সচেতন নাগরিকরা।

অবৈধ কলোনী ও রমরমা গ্যাস বাণিজ্য:

ক্রয়কৃত ওই পাঁচ কাঠা জমিতে রাতারাতি ‘বাহার মিয়া কলোনী’ গড়ে তুলে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ২০টি ভাড়াঘর। এসব ঘর থেকে প্রতি মাসে আদায় করা হচ্ছে অন্তত ৮০ হাজার টাকা ভাড়া। ২০০৯ সালের পর নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ২০১১ সালের দিকে কেনা এই জমিতে কীভাবে আবাসিক গ্যাস সংযোগ মিলল, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর রহস্য। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনুমোদনহীন যেকোনো সংযোগ সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি সম্পত্তি দখলের মহা উৎসব:
ব্যক্তিগত জমির পাশাপাশি রৌফাবাদে ত্রাণ ও পুনর্বাসন খাতের সরকারি জমিও নির্বিচারে দখল হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ১১ নম্বর দাগের প্রায় চার গণ্ডা জমিতে রুবেল নামের এক ব্যক্তি বহুতল ভবন তুলছেন। অন্যদিকে ১ নম্বর খতিয়ানের প্রায় ২৪ শতাংশ জায়গা দখল করে সোলায়মান, ফারুক ও রনি নামের কয়েকজন পাকা দোকান নির্মাণ করেছেন।
​বিহারীদের সংগঠন এডহক কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন লিটন জানান, রৌফাবাদে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের মোট ৮ একর ৪১ শতাংশ বেদখল জমি উদ্ধারে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও আশানুরূপ সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
​প্রশাসনের দায়সারা ভূমিকা ও অভিযুক্তদের লুকোচুরি
এ বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা সংবাদ প্রকাশের পর তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে অভিযুক্ত ক্রেতা শাহাদাৎ হোসেন বাহার ও বিক্রেতা ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজার সঙ্গে সাংবাদিকরা যোগাযোগ করলে তারা প্রথমে বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং অসংলগ্ন কথা বলে ফোন কেটে দেন। উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর আবাসন সংকট দূর করতে এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় দ্রুত যৌথ তদন্ত ও কঠোর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।