জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে ইতিহাসের মাইলফলক
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মাইলফলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।
তিনি বলেন, এই নির্বাচনের মূল লক্ষ্য হলো দেশে স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটানো এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারসাম্য নিশ্চিত করা, যাতে কোনো একটি রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করতে না পারে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানীর বাসাবোতে ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের বিশুদ্ধানন্দ শুদ্ধানন্দ মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মতবিনিময় সভার মূল উদ্দেশ্যে ছিল গণভোটের প্রচার ও ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করা।
সভার আয়োজন করে বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট এবং ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংসদে ‘উচ্চকক্ষ’ গঠনের প্রস্তাব এসেছে, যা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ভারসাম্য নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে বিচারবিভাগীয় কমিটির সংশ্লিষ্টতা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে কেউ একক সিদ্ধান্তে দায়মুক্তি না পায়।
তিনি আরও বলেন, এই সরকার ক্ষমতার লোভে নয়, দায়িত্ব পালনের জন্য এসেছে।
নির্বাচনের পর উপদেষ্টারা সবাই নিজ নিজ পেশায় ফিরে যাবেন। বিগত দেড় বছরে আমরা কোনো বোনাস বা অতিরিক্ত সুবিধা নেইনি। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য।
সভায় বক্তব্যে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।
সমাজে শান্তি বজায় রাখতে শিক্ষা ও সহনশীলতার বিকল্প নেই। জুলাই সনদের মূল বার্তা হলো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। নাগরিকের মানবিক অধিকার নিশ্চিত না হলে সমাজে অশান্তি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনে সুশাসন অপরিহার্য। সুশাসন ছাড়া প্রশাসন, পুলিশ বা কোনো প্রতিষ্ঠানই সঠিকভাবে জনগণের সেবা দিতে পারে না।
জুলাই সনদ সেই সুশাসনের পথ সুগম করবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐক্যমত) মনির হায়দার বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হলেও গত ৫৪ বছরে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সংবিধানের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বারবার স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের অপশাসনের বিরুদ্ধে একটি অনিবার্য বিস্ফোরণ। সেই বিজয়কে টেকসই করতে রাষ্ট্র সংস্কার জরুরি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ৮৪টি সুপারিশ সংবলিত ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করেছে।
মনির হায়দার বলেন, এই ৮৪টি সুপারিশের মধ্যে ৪৮টি সরাসরি সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত। এসব মৌলিক পরিবর্তন জনগণের সম্মতিতে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৬ সালে গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। জনগণ যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়, তাহলে ভবিষ্যতের সংসদ সদস্যরা এসব সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, সংবিধান যেন আর নিপীড়নের হাতিয়ার না হয়ে জনগণের ঢাল হিসেবে কাজ করে এই লক্ষ্যেই জুলাই সনদ ও গণভোট।
সভায় আরেক বিশেষ অতিথি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিনটি জাতীয় নির্বাচনে মানুষ প্রকৃত অর্থে ভোট দিতে পারেনি। এর পেছনে সংবিধানের কিছু ধারা দায়ী, যা একজন ব্যক্তিকে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিয়েছে।
তিনি বলেন, অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে ভারসাম্য আনার কথা বলা হয়েছে।
অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দুটি ব্যালটে ভোট হবে। একটি জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটি গণভোটের জন্য। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাতে পারবেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ভবেশ চাকমা।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি শ্রীমত বুদ্ধপ্রিয় মহাথের, রমনা সেন্ট মেরীস ক্যাথেড্রাল চার্চ প্রধান পালক ফাদার আলবার্ট টমাস রোজারিও, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ড. সুকোমল বড়ুয়া, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি পিউস কস্তাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সুশীল সমাজের নেতারা।