, , চট্টগ্রাম

অনন্য চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বিআরটিএ’তে ডিডি মাসুদের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি!

দেশে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রসঙ্গ এলে যে প্রতিষ্ঠানের নাম সবার আগে উঠে আসে তার মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে নিম্নপদস্থ কর্মচারী থেকে শুরু করে উচ্চ পদধারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ বহু পুরনো।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী শাসনের ১৫ বছরে এই প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির গতি ছিল দুর্দান্ত। তেমনি একটি বড় চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমানে চট্টগ্রাম বিআরটিএ বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জি.) মাসুদুল আলম। তখন পুরো বাংলাদেশে ছিল মাসুদের বড় নেটওয়ার্ক। পলাতক ওবায়দুল কাদেরের অর্থ যোগানদাতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এই মাসুদ। শুধু তাই নয়, জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে কাদেরের নেতৃত্বে আন্দোলন নস্যাতের ষড়যন্ত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এই মাসুদ।

জানা গেছে, ছাত্র আন্দোলন নস্যাতের অন্যতম কারিগর মাসুদুল আলম তার এই ট্যাগ কাটিয়ে কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি নিয়েছেন চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক (ইঞ্জি.) হিসেবে। চট্টগ্রাম কার্যালয়ের ১৩টি ও সিলেট বিভাগের ৪টি মিলে মোট ১৭টি কার্যালয়ের মূল কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন এই মাসুদুল আলম। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন বিআরটিএ’র এই দুই কার্যালয়ে চলছে এখন ওপেন অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য। সেবাপ্রার্থীরা বলছেন, সেই ভাইরাল মাসুদ এখনো ভালো হননি। জানা গেছে, ২০১৭ সালে বিআরটিএ মিরপুর কার্যালয়ে উপপরিচালক (ইঞ্জি.) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি বিআরটিএর মিরপুর কার্যালয় পরিদর্শনকালে তার অনিয়ম-দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সতর্ক করে এই কর্মকর্তাকে তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ভালো হয়ে যাও মাসুদ, ভালো হয়ে যাও। তোমাকে আমি অনেক সময় দিয়েছি। তুমি ভালো হয়ে যাও। তুমি কি এখানে আবার পুরোনো খেলা শুরু করেছ? তুমি কি কোনোদিনও ভালো হবে না?সেতুমন্ত্রীর এমন বক্তব্য পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই তুমুল আলোচনায় ছিলেন এই কর্মকর্তা। যা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

তখন ওবায়দুল কাদেরের মন্তব্য বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তোলে। তখন থেকে ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন মাসুদ। ঝড় ওঠানো সেই মাসুদ বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে কী করছেন? সেবাগ্রহীতারা কি নির্বিঘ্নে সেবা নিতে পারছেন? খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সেখানে অবাধেই পুরোনো চক্র ঘুরেফিরে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস, নিবন্ধনসহ বিভিন্ন খাতে গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন ঘুষ না দিলে।

প্রশ্ন উঠেছে মাসুদ কি আগের মতোই আছেন, নাকি ভালো হয়ে গেছেন? বিআরটিএ সূত্র বলছে, সেই মাসুদ অতীতের বদনাম বদলের চেষ্টা না করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এখনো পর্যন্ত তিনি ভালো হননি। কারণ যেখানে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানেই ছিল তিনি দুর্নীতির মূর্তিমান আতংঙ্ক। আর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দায়িত্ব পেয়ে তিনি এখন রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। তার নিয়ন্ত্রিত এই দুই কার্যালয়ে দুর্নীতি-অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য চলছে চরমে….।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে সেবাগ্রহীতাদের সেবা নিতে ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ প্রতিরোধে মাসুদ নানা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে ঘুষ বন্ধ হতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে মাসুদের হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা ও কল করে মাসুদুল আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মাসুদ সংবাদমাধ্যমে কথা বলতে নারাজ। তবে তিনি প্রতিবেদককে অফিসে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

জানা যায়—গত বছরের ২৫ মার্চ ২০২৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে পরিচালক পদে যোগ দেন। তিনি চট্টগ্রাম বিআরটিএতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি দেখে বোঝা গেছে, সেখানে শৃঙ্খলা তো দুরের কথা, ঘুষ বাণিজ্য ছাড়া কিছুই হয়না এখানে। ফিটনেস শাখা, নিবন্ধন শাখা, মালিকানা বদলসহ বিভিন্ন শাখায় দালাল চক্রের মহোৎসব চলছে। তবে অভিযোগ পেলে দালালদের বিরুদ্ধে লোক দেখানো ব্যবস্থা নিলেও একদিন যেতে না যেতেই দালাল চক্র আবার সক্রিয় হয়ে কাজ করেন।

তবে সেবাগ্রহীতারা জানান, গত বছরে ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও এক দালালকে অতিরিক্ত চার হাজার টাকা দিয়েছিলেন। দেড় মাস আগে পরীক্ষা দিয়েছেন। লাইসেন্স কবে পাবেন তা কেউ বলতে পারছে না।

এক অটোরিকশাচালক বলেন, হালকা শ্রেণির ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে দালালের কাছে অতিরিক্ত ছয় হাজার টাকা দিয়েছি। ঘুষ দেওয়ার দুই মাস পরও তিনি লাইসেন্স পাননি। আরেকজন বলেন, এক দালালের মাধ্যমে ফিটনেস বাবদ সাড়ে ১১ হাজার টাকা (আয়কর ছাড়া) খরচ হয়। এই টাকা দেওয়ার পরও ঘুরতে হচ্ছে।

বিআরটিএ সূত্র জানায়—চট্টগ্রামে আসার আগে মাসুদ ২০২২ সালের ২১ জুন খুলনা বিআরটিএর বিভাগীয় পরিচালকের দায়িত্ব পান। সেখানেও তাঁর দায়িত্বকালীন খুলনা বিআরটিএতে ঘুষ বাণিজ্য অব্যাহত ছিল। তারপর চট্টগ্রামে বিভাগীয় কার্যালয়ে বিভাগীয় পরিচালকের দায়িত্ব নিয়েই চট্টগ্রাম বিআরটিএতে গ্রাহকের ভোগান্তি শূন্য কোঠায় নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি বরং অনিয়ম দুর্নীতি চলছে দুর্দান্ত গতিতে।

সূত্র—সকালের সময়